প্রথম আলো

মারতে মারতে মৃত ভেবে ফেলে যায় তারা!

ভোরে বাড়ির পাশের মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছিল মতি মিয়ার ছেলে সাফিক। এ সময় পূর্ববিরোধের জেরে তাকে রাস্তা থেকে টেনেহিঁচড়ে ধরে আনা হয় একই গ্রামের লতিফের বাড়িতে। বাড়ির আঙিনায় একটি বরই গাছে বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানো হয় কিশোর সাফিকের ওপর। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের স্বল্পযশোদল কালিকাবাড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

আহত শাফিক বর্তমানে শরীরে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে তিন দিন ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এ নিষ্ঠুর ও নির্মম ঘটনার চার দিন অতিবাহিত হলেও গ্রেফতার হয়নি কেউ। এ ঘটনায় বিচারপ্রার্থী মায়ের বুকফাটা আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ।

ঘটনার দিন ফজরের নামাজ পড়তে শাফিকের সঙ্গে ঘর থেকে বের হওয়া সঙ্গী প্রতিবেশী কিশোর নাজমুল হাসান পাপন জানায়, আমরা একসঙ্গে নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় তার সামনেই তারা তাকে ধরে নিয়ে যায়। বাড়িতে নিয়ে কানের ফুল চুরির মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার ওপর বীভৎস নির্যাতন চালায়।

এ সময় সে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরে আশপাশের লোকজনকে জানালে তারাও ছুটে আসতে আসতে মরে গেছে ভেবে শাফিককে নিয়ে ওই জঙ্গলে ফেলে আসে। পরে খবর পেয়ে প্রতিবেশীরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার ফরিদ মিয়ার সহযোগিতায় অর্ধমৃত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠায়।

ঘটনার সময় আশপাশের লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মারের দৃশ্য দেখলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। এক সময় মৃত ভেবে একটি বাঁশঝাড়ের পাশে ফেলে রাখা হয় তাকে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। ভোরে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে সাফিককে ধরে নিয়ে যান কালিকাবাড়ি গ্রামের মো. আবদুল লতিফ।

নির্যাতনের শিকার শাফিক মিয়া কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল কালিকাবাড়ি গ্রামের রিনা বেগমের কিশোরপুত্র। সে পেশায় অটোরিকশাচালক।

চিকিৎসকরা বলছেন, রোগীর অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। পুলিশ বলছে, আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। এ ঘটনাটিকে চাঞ্চল্যকর ঘটনা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, কিশোরগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট এম এ আফজল।

মারের সময় যন্ত্রণাকাতর শাফিক প্রাণভিক্ষা চেয়ে বাঁচার আকুতি জানালেও অসুররূপী ৮-৯ জন নারী পুরুষের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সে। নির্যাতনের একপর্যায়ে মৃত্যু হয়েছে ভেবে বাড়ি থেকে কয়েকশ’ গজ দূরে একটি বাঁশঝাড় সংলগ্ন কবরস্থানের পাশে নিয়ে ফেলে রাখা হয় তাকে। সেখান থেকে মৃতপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার করে এলাকাবাসী তাকে নিয়ে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু নির্যাতনকারীরা এতই প্রভাবশালী যে, একদিনের মধ্যেই প্রভাব খাটিয়ে হাসপাতাল থেকে ওই মুমূর্ষু অবস্থায় তার ভর্তি বাতিল করে বের করে দেয়া হয়। পরে স্থানীয় মানবাধিকার ও গণমাধ্যম কর্মীদের হস্তক্ষেপে পুনরায় তাকে ভর্তি করে হাসপাতাল কর্তপক্ষ।

রোববার (২৮ অক্টোবর) বিকালে কালিকাবাড়ি গ্রাম সরেজমিন পরিদর্শনকালে গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে এ নিষ্ঠুর নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ৯ নারী-পুরুষ বসতঘরে তালা ঝুলিয়ে গা ঢাকা দেয়।

এ সময় গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্যাতনকারীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। ওইদিন মদিনা নামের এক মহিলার কানের স্বর্ণের ফুল চুরির মিথ্যা অভিযোগ তুলে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গাছে বেঁধে নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত নির্যাতনের ঘটনা দেখে নীরবে হজম করা ছাড়া প্রতিবাদ করার কারও সাহস ছিল না।

কালিকাবাড়ি গ্রামের বাদল মিয়া বলেন, ভোরে ছেলেটিকে ধরে নিয়ে গাছের সঙ্গে হাত পেছন দিক থেকে বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। কিল-ঘুষি-লাথি মেরেও তারা থামেনি; ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে হাত-পায়ে জখম করা হয়। এক সময় শাফিক জ্ঞান হারিয়ে ফেললে মৃত ভেবে বাঁশঝাড়ের পাশে ফেলে রাখা হয়।

একই এলাকার ফরিদ মিয়া বলেন, স্থানীয় মেম্বারকে খবর দিয়ে আমি নিজে ২০০ টাকা দিয়ে ছেলেটিকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। এমন নির্যাতন মানুষ মানুষকে করে না।

এ সময় কয়েকজন নারী জানান, তারা নিজের চোখে ঘটনার নির্মমতা দেখলেও কিছুই করার ছিল না। লতিফ মিয়া প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি।

এদিকে, সাংবাদিকের মাধ্যমে ঘটনাটি জেনে তড়িঘড়ি করে থানায় মামলা রুজু করেন পুলিশ। এর আগে বিষয়টি জানানো হলেও গুরুত্ব দেয়নি পুলিশ।

No comments:

Post a Comment